পণ্ডিতমশাই' উপন্যাসের নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে আলোচনা করো।

 পণ্ডিতমশাই' উপন্যাসের নামকরণ কতদূর সার্থক হয়েছে আলোচনা করো।


বিশ্ববরেণ্য সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়র বলেছেন, নামে কী যায় আসে? গোলাপকে যে নামেই ডাকা যাক না কেন গোলাপ সুন্দরই থাকবে। শেক্সপিয়র কী ভেবে কথাটি বলেছেন জানি না। কিন্তু ব্যক্তি বা বস্তুর নামে তাঁর এ মতামত কাজে লাগলেও সাহিত্যের নামকরণের ক্ষেত্রে লাগবে না।
কারণ ব্যক্তি বা বস্তুর নাম তার স্বভাব-চরিত্র বা চেহারার সাথে না মিললেও চলে কিন্তু সাহিত্যের ক্ষেত্রে নামকরণ ঠিকঠাক হতেই হয়। কারণ তা না হলে পাঠক বিভ্রান্ত হয় বা অতৃপ্ত থেকে যায়।


উপন্যাসে বৃন্দাবন গ্রামের পণ্ডিতমশাই। বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে বিত্তশালী
বৃন্দাবন নিজের পরিশ্রমে শিক্ষা অর্জন করেছেন। সেই গ্রামে শিক্ষার বিন্দুমাত্র সুযোগ ছিল না। বৃন্দাবন নিজে শিক্ষা অর্জন করে গ্রামের সকল মানুষকে শিক্ষিত করতে চেয়েছেন। অশিক্ষা, অন্ধ সংস্কার, জাতিভেদ প্রভৃতি থেকে গ্রামীণ মানুষকে উদ্ধার করতে হলে শিক্ষাবিস্তার ছাড়া আর কোনো পথ নেই এটা বৃন্দাবন বুঝেছিলেন। তাই তিনি হয়ে উঠেছে 'পণ্ডিতমশাই'। আর পণ্ডিতমশাই নিছক একটা পরিচয়ে আবদ্ধ থাকেননি। হয়ে উঠেছেন এক ব্যক্তির দীর্ঘ সংগ্রামের ফল। এখানেই নামকরণ হয়ে উঠেছে বিশেষ তাৎপর্যবাহী। 'পণ্ডিতমশাই' উপন্যাসটি আলোচনা করতে গিয়ে মনে পড়ে যায়
শরৎচন্দ্রেরই লেখা 'পল্লীসমাজ' উপন্যাসের কথা। সেখানে রমেশ কুয়াপুর গ্রামে শিক্ষাবিস্তারে উদ্যোগী হয়েছিলেন। আলোচ্য 'পণ্ডিতমশাই' উপন্যাসেও বৃন্দাবন সখের দ্বারা চালিত হয়ে শিক্ষাবিস্তারে উদ্যোগী হননি। একটা মহৎ উদ্দেশ্য বা আদর্শ নিয়ে বৃন্দাবন এই কর্মকাণ্ডের নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি প্রকৃতই বুঝেছিলেন গ্রামে শিক্ষাদীক্ষার কতটা প্রয়োজন। শুধু পাঠশালা খুলে পণ্ডিতি করে বৃন্দাবন ক্ষান্ত হননি। সেই পাঠশালায় একটি নিয়ম চালু করেছেন। সেটি হলো প্রতিদিন বাড়ি
যাবার আগে প্রতিজ্ঞা করো বড়ো হয়ে প্রত্যেকে অন্তত দু'জন ছেলেকে লেখাপড়া শিখাবে। বৃন্দাবনের বিশ্বাস, এইভাবে চলতে চলতে একদিন বাংলাদেশে প্রতিটি মানুষ শিক্ষিত হয়ে যাবে। অন্তরের আদর্শ থেকেই বৃন্দাবন অশিক্ষিতকেও আলোকিত করে তুলতে চেয়েছিলেন। ঠিক 'পল্লীসমাজে'র বিশ্বেশ্বরী যেমন বলেছিলেন "আলো জ্বেলে দে"-এই আলো জ্বালার জীবনদর্শনটিই প্রতিফলিত হয়েছে বৃন্দাবনের জীবনভাবনা মধ্যে। আর বৃন্দাবনের এই ভাবনা ও অনুভূতি তাঁকে গ্রামবাসীর পণ্ডিতমশায়ে' পরিণত করেছে। কোনো গভীর চিন্তা থেকে নয়, সাধারণ মানুষ সরল বিশ্বাসে তাঁকে পণ্ডিতমশায় ভেবেছে। তাই 'পণ্ডিতমশাই' নামটি ভাব ও ব্যঞ্জনা উভয় দিক দিয়েই সার্থক।


শরৎচন্দ্রের পণ্ডিতমশাই যথার্থ শিক্ষার আলোকে শিক্ষিত। যাকে বলা যায় মুক্ত শিক্ষার আলোকে শিক্ষিত। গ্রামীণ পাঠশালার পণ্ডিত হলেও তিনি অন্ধবিশ্বাসী নন। যথার্থ বিচার-বিবেচনা ও বিশ্লেষণের ক্ষমতার মধ্যেই বৃন্দাবনের পণ্ডিতমশাই সত্তাটি নিহিত।


উপরিউক্ত আলোচনায় বোঝা যায়, বৃন্দাবন মহৎ আদর্শ ও কঠোর তপস্যার জন্যই সকলের কাছে 'পণ্ডিতমশাই' হিসাবে শ্রদ্ধা পেয়েছেন। পণ্ডিতমশাই-এর অর্থ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার মধ্য দিয়ে সকলের মুক্তি। এই বৃহত্তর তাৎপর্যের কারণেই পণ্ডিতমশাই নামকরণ সার্থক হয়েছে একথা বলতে অসুবিধা নেই।

Post a Comment

0 Comments