মনসামঙ্গল কাব্য: কাহিনি, প্রধান তিন কবির পরিচয় ও কাব্যসৌন্দর্য বিচার।

 মনসামঙ্গল কাব্য: কাহিনি, প্রধান তিন কবির পরিচয় ও কাব্যসৌন্দর্য বিচার।

👇কলেজের ছাত্র ছাত্রীর জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নিচে এর সম্পূর্ণ উত্তর রয়েছে লিখে নাও👇




আমাদের নিজস্ব YouTube চ্যানেল

https://youtube.com/@ksponlineclass?si=wnaUGbKphXzGqHoI


উত্তর
মনসা দেবী কিংবা মনসার সুন্দর কীর্তিকে আলোচনা করবার আগে আমরা তিনজন কবির  নাম জেনে নিই। এই লেখনীর পিছনে অনেক কাহিনী রয়েছে অনেক তথ্য রয়েছে তার মধ্যে থেকে তিনজন শ্রেষ্ঠ কবির নাম কিংবা তাদের সম্পর্কে কিছু তথ্য তা হল আমরা প্রথম দিকে (চতুর্দশ শতাব্দীর পূর্বে) মঙ্গলকাব্যের কাহিনী স্ত্রী-সমাজে ব্রতকথা ও ছড়ার মধ্যে বেঁচে ছিল। পরে পঞ্চদশ শতকের দিকে বাংলা সাহিত্যের গঠনের যুগে এই সমস্ত লৌকিক দেবদেবীর মহিমাবিষয়ক ব্রতকথাটি দীর্ঘবিস্তারী আখ্যানকাব্যের আকার লাভ করল। আমাদের অনুমান বাংলাদেশে মনসামঙ্গলের রচনা সর্বপ্রথম আরম্ভ হয়- পঞ্চদশ শতকের শেষভাগে, তখন মনসামঙ্গলের কয়েকজন শক্তিশালী কবির আবির্ভাব হয়েছিল। তাঁরা হলেন বিজয়গুপ্ত, নারায়ণদেব ও বিপ্রদাস পিপলাই। এঁদের মধ্যে প্রথম দুজন পূর্ব- বঙ্গের কবি, তৃতীয় জন হচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের কবি। কিন্তু কারও কারও মতে মনসামঙ্গল ধারার আদিকবি হলেন কানা হরিদত্ত। বিজয়গুপ্ত তাঁর পদ্মাপুরাণের প্রারম্ভে মনসামঙ্গলের আদিকবি কানা হরিদত্তের নাম উল্লেখ করে বলেছেন যে, মনসামঙ্গলের প্রথম গীতিকার কানা হরিদত্ত। কানা হরিদত্তের বিচারবুদ্ধি সীমাবদ্ধ ছিল, তাঁর ত্রুটিপূর্ণ পাঁচালি দেবীর মনঃপূত হয়নি। তিনি তখন বিজয়গুপ্তকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে বিশুদ্ধতর কাব্য লিখতে নির্দেশ দিলেন। দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয় 'পদ্মার সর্পসজ্জা' শীর্ষক কয়েকটি ছত্রকে কানা হরিদত্তের রচনা বলে "গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এ ভাষা আদৌ পুরাতন নয় বলে আমরা এই রচনাকারকে প্রাচীন কবি বলে গ্রহণ করতে রাজি নই। অপেক্ষাকৃত পরবর্তিকালে হরিদত্ত নামে মনসামঙ্গলের একাধিক কবি জন্মগ্রহণ করেন। দীনেশচন্দ্র উল্লিখিত 'পদ্মার সর্পসজ্জা' সেই ধরনের কোনো আধুনিক হরিদত্তের রচনা। তবে বিজয়গুপ্তের কাব্যের উল্লেখ থেকে মনে হচ্ছে হরিদত্ত নামে কোনো কবি তাঁর আগে পাঁচালি ধরনের কোনো রচনায় মনসামঙ্গলের কাহিনী বিবৃত করেছিলেন। কিন্তু এঁর বিষয়ে শুধু বিজয়গুপ্তের উল্লেখ ভিন্ন আর কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এবার আমরা পঞ্চদশ শতকের কয়েকজন প্রধান কবির কথা বলি।
বিজয়গুপ্ত॥ বরিশাল জেলার আধুনিক গৈলা গ্রামে (প্রাচীন নাম ফুল্লত্রী) বিজয়গুপ্তের জন্ম হয়। তাঁর আবির্ভাবের সন-তারিখ সম্বন্ধে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। তাঁর কোনো- কোনো পুঁথিতে পুঁথিসমাপ্তির শকাব্দের উল্লেখ আছে বটে। তাই থেকে মনে হয় কবি পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সনাতন, জননী রুক্মিণী-এর বেশি কোনো পরিচয় কবি দেননি। শোনা যায়, তিনি নাকি স্বগ্রামে মনসার মন্দির ও মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-এখনও তার নিদর্শন পাওয়া যায়। বরিশাল থেকে বাংলা ১৩০৩ সালে সর্বপ্রথম বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়, তারপর এর একাধিক পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। অবশ্য মুদ্রিত গ্রন্থের ভাষা বিশেষ প্রাচীন নয়, এর মধ্যে বিজয়গুপ্তের ভণিতার সঙ্গে আরও অনেকের ভণিতা আছে। সুতরাং কোনো কোনো সমালোচক বিজয়গুপ্তের প্রামাণিকতায় সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তবে এ সন্দেহ অমূলক। কারণ বিজয়গুপ্তের পুঁথি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আাছে।" আমরা মুদ্রিত কাব্য ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পুথির পাঠের তুলনামূলক আলোচনা করে দেখেছি, ছাপা গ্রন্থের অনেক জায়গায় কলম চালানো হয়েছে। সুতরাং বিজয় গুপ্তের পুঁথি যে খুব
বিশুদ্ধ ও প্রাচীন কোথাও
তা মনে হয় না। এর ভাষা অনেক জ্বলে আধুনিক কালের মতো, কোথাও পশ্চিমবঙ্গীয় বান্ধারার প্রভাবও আছে। মনসামঙ্গল কাব্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ ও পূর্ববঙ্গের বিজয়গুপ্তের কাব্যের সমধিক সমাদর হয়েছিল। এই দু'খানা কাব্য মনসামঙ্গলের কাব্যের মধ্যে সর্বপ্রথম মুদ্রণের গৌরব লাভ করে। অত্যধিক জনপ্রিয়তার জন্য বিজয়গুপ্তের ভাষার নানা পরিবর্তন হয়েছে। তাই বলে তাঁর কাব্যকে অপ্রামাণিক বলে তাচ্ছিল্য করা যুক্তিযুক্ত নয়। কোন মধ্যযুগীয় কাব্যেই বা হস্তক্ষেপ হয়নি? কৃত্তিবাসি রামায়ণ ও চণ্ডীদাসের পদাবলী তার উৎকট দৃষ্টান্ত। কৃত্তিবাসি রামায়ণে বহু পরিবর্তন হয়েছে বলে কি তাঁর কাব্যকে আমরা বাংলা সাহিত্যের প্রাঙ্গণ থেকে বহিষ্কৃত করতে পারি? বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ সম্বন্ধে আমরা একই যুক্তি পাই বিজয়গুপ্তের পুঁথির সংখ্যা খুব বেশি নয়। কাব্যরচনার শকাব্দের উল্লেখ এক নয়। সেই করতে চাই। যে পুঁথিগুলি পাওয়া গেছে, তার কয়েকখানিতে আছে হেঁয়ালির ভঙ্গিতে, এবং হেঁয়ালির ভাষাও সব পুঁথিতে হেঁয়ালির মর্মোদঘাটন করলে এই খ্রীস্টাব্দগুলি পাওয়া যাবে-১৪৯৪, ১৪৭৮, ১৪৮৪ অব্দ। তাঁর কাব্যের একস্থলে সুলতান হুসেন শাহের উল্লেখ আছে। ১৪৭৮ বা ১৪৮৪ খ্রীঃ অব্দে বাংলার সিংহাসনে হুসেন শাহকে পাই না। তিনি ১৪৯৩ খ্রীঃ অব্দে বাংলার সিংহাসন অধিকার করেন। তাই মনে হয় বিজয়গুপ্তের কাব্য হুসেন শাহের সিংহাসন লাভের পর রচিত হয়-১৪৯৪ খ্রীঃ অব্দে হলেও হতে পারে। আছে বিজয়গুপ্ত সম্বন্ধে অনেকে খুব প্রশংসাসূচক বাক্য ব্যবহার করেন বটে, কিন্তু বিশুদ্ধ কাব্যলক্ষণের বিচারে তাঁর কাব্য বিশেষ প্রশংসা পাবে না। মনসার ঈর্ষাকুটিল বিষাক্ত চরিত্রটি মোটামুটি মন্দ হয়নি। শিবের হাস্যকর ভাঁড়ামি ধূলিধূসর মঙ্গলকাব্যের আদর্শকেই স্মরণ করিয়ে । চাঁদসদাগরের চরিত্রে প্রচণ্ড পৌরুষের সঙ্গে স্থূলতার সমাবেশে এর মহিমা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বেহুলার চরিত্রাঙ্কনে কবি সমস্ত মাধুর্য ও পবিত্রতা ঢেলে দিয়েছেন। স্থূল রঙ্গরসে বৈদ্য- বিশেষ কৃতিত্ব ছিল, তা স্বীকার করতে হবে। সে যাই হোক, কাব্যটি যতটা জনপ্রিয় তবে কবির হয়েছে ততটা কাব্যগুণের
দেয়
অধিকারী নয়। বিপ্রদাস পিল্লাই। প্রায় সমসাময়িক কবি বিপ্রদাস পিল্লাই যে মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন তার নাম 'মনসাবিজয়'। এই কবি সম্বন্ধে কিছুকাল পূর্বেও অনেকে কিছু জানতেন না। এঁর খান চারেক পুঁথি পাওয়া গেছে, তাই থেকে এঁর কাব্যের পরিচয় উদ্ধার করা হয়েছে। অবশ্য একখানি বাদে আর সমস্ত পুঁথি এত গোলমালে ভরা যে, কবির যথার্থ কাব্যরূপ নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। বিপ্রদাস বসিরহাটের নিকট (চব্বিশ পরগণা
) বাদুড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুঁথিগুলিও কলকাতার নিকটবর্তী অঞ্চল থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি যে পশ্চিবঙ্গের কবি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কাব্যের প্রারম্ভে কবি সংক্ষেপে আত্মপরিচয় দিয়েছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে নাদুড়্যা বটগ্রাম, মতান্তরে বাদুড়িয়া গ্রামে পিল্লাই শাখা-ভুক্ত ব্রাহ্মণবংশে কবি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুকুন্দ পণ্ডিত। কবি ১৪৯৫ খ্রীঃ অব্দে কাব্য সমাপ্ত করেন, পুঁথিতে যে সন-শকাব্দের উল্লেখ আছে, তাঁ থেকেই এই খ্রীস্টাব্দ পাওয়া যায়। কিন্তু পুঁথির ভাষা প্রাচীন নয়, কোনো কোনো স্থানে উৎকট আধুনিক বাক্যবিন্যাসও আছে। বিজয়গুপ্ত সম্বন্ধে সংশয় উত্থাপিত হলে বিপ্রদাস সম্বন্ধেও অনুরূপ সংশয় অনায়াসেই উঠতে পারে। বিশেষত এ কাব্যে এমন কতকগুলি আধুনিক স্থানের উল্লেখ আছে যে, এর প্রাচীনত্বের কিছু সংশয় জন্মায়। কবি যেভাবে কলকাতা ও খড়দহের উল্লেখ করেছেন, তাতে তাঁকে উত্তর-চৈতন্যযুগের কবি বলে মনে খুব বিশুদ্ধ ও প্রাচীন তা মনে হয় না। এর ভাষা অনেক স্থলে আধুনিক কালের মতো, কোথাও কোথাও পশ্চিমবঙ্গীয় বান্ধারার প্রভাবও আছে। মনসামঙ্গল কাব্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ ও পূর্ববঙ্গের বিজয়গুপ্তের কাব্যের সমধিক সমাদর হয়েছিল। এই দু'খানা কাব্য মনসামঙ্গলের কাব্যের মধ্যে সর্বপ্রথম মুদ্রণের গৌরব লাভ করে। অত্যধিক জনপ্রিয়তার জন্য বিজয়গুপ্তের ভাষার নানা পরিবর্তন হয়েছে। তাই বলে তাঁর কাব্যকে অপ্রামাণিক বলে তাচ্ছিল্য করা যুক্তিযুক্ত নয়। কোন্ মধ্যযুগীয় কাব্যেই বা হস্তক্ষেপ হয়নি? কৃত্তিবাসি রামায়ণ ও চণ্ডীদাসের পদাবলী তার উৎকট দৃষ্টান্ত। কৃত্তিবাসি রামায়ণে বহু পরিবর্তন হয়েছে বলে কি তাঁর কাবাকে আমরা বাংলা সাহিত্যের প্রাঙ্গণ থেকে বহিষ্কৃত করতে পারি? বিজয়গুপ্তের পদ্মাপুরাণ সম্বন্ধে আমরা একই যুক্তি পেশ করতে চাই।
বিজয়গুপ্ত সম্বন্ধে অনেকে খুব প্রশংসাসূচক বাক্য ব্যবহার করেন বটে, কিন্তু বিশুদ্ধ কাব্যলক্ষণের বিচারে তাঁর কাব্য বিশেষ প্রশংসা পাবে না। মনসার ঈর্ষাকুটিল বিষাক্ত চরিশ্রটি মোটামুটি মন্দ হয়নি। শিবের হাস্যকর ভাঁড়ামি ধূলিধূসর মঙ্গলকাব্যের আদর্শকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। চাঁদসদাগরের চরিত্রে প্রচণ্ড পৌরুষের সঙ্গে স্থূলতার সমাবেশে এর মহিমা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তবে বেহুলার চরিত্রাঙ্কনে কবি সমস্ত মাধুর্য ও পবিত্রতা ঢেলে দিয়েছেন। স্থূল রঙ্গরসে বৈদ্য- কবির বিশেষ কৃতিত্ব ছিল, তা স্বীকার করতে হবে। সে যাই হোক, কাব্যটি যতটা জনপ্রিয় হয়েছে ততটা কাব্যগুণের অধিকারী নয়।
বিপ্রদাস পিল্লাই।। প্রায় সমসাময়িক কবি বিপ্রদাস পিল্লাই যে মনসামঙ্গল কাব্য রচনা করেন তার নাম 'মনসাবিজয়'। এই কবি সম্বন্ধে কিছুকাল পূর্বেও অনেকে কিছু জানতেন না। এঁর খান চারেক পুঁথি পাওয়া গেছে, তাই থেকে এঁর কাব্যের পরিচয় উদ্ধার করা হয়েছে। অবশ্য একখানি বাদে আর সমস্ত পুঁথি এত গোলমালে ভরা যে, কবির যথার্থ কাব্যরূপ নির্ধারণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
বিপ্রদাস বসিরহাটের নিকট (চব্বিশ পরগণা) বাদুড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুঁথিগুলিও কলকাতার নিকটবর্তী অঞ্চল থেকেই উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি যে পশ্চিবঙ্গের কবি তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কাব্যের প্রারম্ভে কবি সংক্ষেপে আত্মপরিচয় দিয়েছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে নাদুড়্যা বটগ্রাম, মতান্তরে বাদুড়িয়া গ্রামে পিল্লাই শাখা-ভুক্ত ব্রাহ্মণবংশে কবি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুকুন্দ পণ্ডিত। কবি ১৪৯৫ খ্রীঃ অব্দে কাব্য সমাপ্ত করেন, পুঁথিতে যে সন-শকাব্দের উল্লেখ আছে, তাঁ থেকেই এই খ্রীস্টাব্দ পাওয়া যায়। কিন্তু পুঁথির ভাষা প্রাচীন নয়, কোনো কোনো স্থানে উৎকট আধুনিক বাক্যবিন্যাসও আছে। বিজয়গুপ্ত সম্বন্ধে সংশয় উত্থাপিত হলে বিপ্রদাস সম্বন্ধেও অনুরূপ সংশয় অনায়াসেই উঠতে পারে। বিশেষত এ কাব্যে এমন কতকগুলি আধুনিক স্থানের উল্লেখ আছে যে, এর প্রাচীনত্বের কিছু সংশয় জন্মায়। কবি যেভাবে কলকাতা ও খড়দহের উল্লেখ করেছেন, তাতে তাঁকে উত্তর-চৈতন্যযুগের কবি বলে মনে হয় তবে এই উল্লেখ প্রক্ষিপ্তও হতে পারে। প্রাপ্ত পুঁথিগুলির পাঠেও বিভ্রান্তি অপনোদিত হতে গায় না। সুতরাং তাঁর পুঁথিগুলি সম্বন্ধে নিশ্চয়ই সন্দেহের অবকাশ আছে। কবি প্রাচীন হলেও ইদানীং তাঁর পুঁথি আবিষ্কৃত হয়েছে এবং কিছুকাল পূর্বে কবি ছাপার
একরে উঠেছেন। ডক্টর সুকুমার সেন মহাশয় এই গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন। কাহিনী ও চরিত্র- তিলে বিপ্রদাসের কৃতিত্ব বিজয়গুপ্তের চেয়ে বেশি তা স্বীকার করতে হবে। বিশেষত হাসান- বাসন পালায় তিনি যেভাবে মুসলমান সমাজের বর্ণনা করেছেন, তাতে মুকুন্দরামকে ছেড়ে মূলে এই সম্বন্ধে তাঁর সমান বিচক্ষণ কবি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এই প্রসঙ্গে কবি উড়িৎ কৌতুকরসেরও আমদানি করেছেন-যদিও কবি বড়ো গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন, তাঁর কাব্যে বিজয়গুপ্তের মতো হাস্যতরল বর্ণনা নেই বললেই চলে। বেহুলা, সনকা, চাঁদ সদাগরের বিত্রগুলি মন্দ হয়নি, কিন্তু কবির বক্তব্য চারুত্ববর্জিত-নিতান্তই সাদাসিধে ধরনের। চাঁদের বাণিজ্য প্রসঙ্গে কবি যে পথঘাটের উল্লেখ করেছেন, পূর্ববঙ্গীয় কবির চেয়ে সে বর্ণনা অধিকতর স্তেবনিষ্ঠ হয়েছে কারণ তিনি ছিলেন স্থানীয় কবি। তাঁর এই পথের বর্ণনায় ভাটপাড়া, লোজোড়, পাইকপাড়া, ভদ্রেশ্বর, রিসড়া, খড়দহ, কামারহাটী এঁড়েদহ, ঘুসুড়ি, চিতপুর, বেতড় ও কলকাতার উল্লেখ আছে এবং উল্লেখ আছে বলেই এ-কাব্যের প্রাচীনতায় ও প্রামাণিকতায় বিশেষ সন্দেহ জন্মে। সে যাই হোক, সহজ বর্ণনায় বিপ্রদাসের মনসাবিজয় নিতান্ত মন্দ হয়নি, নেসার চরিত্রের রুক্ষ নির্মমতাও অনেকটা অন্তর্হিত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে কবিকে অতি প্রশংসার বিশ্বদলে পূজা করবারও প্রয়োজন দেখি না। সর্বোপরি কবির পুঁথির পাঠ সম্বন্ধে নানা গণ্ডগোল আছে বলে তাঁর প্রতিভা সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা বলা যায় না।
নারায়ণদেব। মনসামঙ্গলের কবিদের মধ্যে নারায়ণদেব বিশেষ স্থান দাবি করতে পারেন। একমাত্র তাঁর কাব্যই বাংলা ও অসমে প্রচার লাভ করেছে। তাঁর পুরা ভণিতা সুকবিবল্লভ নারায়ণদেব। অনেকে মনে করেন সুকবিবল্লভ ও নারায়ণদেব দু'জন পৃথক কবি। কিন্তু এ অনুমান যুক্তি দ্বারা সমর্থিত হয় না। তাঁর পদ্মাপুরাণের ভণিতা থেকে 'সুকবিবল্লভ' বা 'কবিবল্লভ' খেতাব বলে মনে হচ্ছে। ইনি যে একজন অতি প্রাচীন কবি, তার প্রমাণ ১৬৯৫ খ্রীঃ অব্দে নকল-করা তাঁর একখানি পুঁথি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। তাঁর এ-কাব্যের আরও অনেক পুঁথি পাওয়া গেছে। কাজেই কবি একদা ময়মনসিংহ ও শ্রীহট্টে অত্যন্ত জনপ্রিয় কবি ছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর পুঁথিতে সংক্ষেপে যে আত্মপরিচয় দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, তাঁর পূর্বপুরুষের আদিনিবাস রাঢ়ভূমি। তাঁরা দেব-উপাধিক কায়স্থ। তাঁর বৃদ্ধ পিতামহ উদ্বারণদেব রাঢ়দেশ ছেড়ে ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জের অন্তর্ভুক্ত বোরগ্রামে বসতি স্থাপন করেন। ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত বোরগ্রাম এখন ময়মনসিংহের অন্তর্ভুক্ত হলেও একদা নাকি এই গ্রাম শ্রীহট্টের মধ্যে ছিল। শ্রীহট্টে তাঁর কাব্য বেশ প্রচারিত আছে, এখনও ছাপা হয়। 'সুকবিবল্লভ' নারায়ণ ভণিতাটি শ্রীহট্টীয় উপভাষায় 'সুকনান্নি'তে পরিণত হয়েছে। এখন এইটে সুকনান্নির যে পদ্মাপুরাণ পাওয়া যায় তার সঙ্গে ময়মনসিংহের নারায়ণদেবের কাব্যের সামান্য স্থানীয় উপভাষা ছাড়া আর কোনো বিষয়ে কোনো পার্থক্য নেই। তাই অনুমান হয় হইহট্ট ও ময়মনসিংহের বোরগ্রামের ভৌগোলিক নৈকট্যের জন্য নারায়ণদেবের কাব্য শ্রীহট্টেও বেশ প্রচার লাভ করেছিল এবং সেইজন্য শ্রীহট্টীয়েরা কবিকে নিজেদের অঞ্চলের কবি বলে রাবি করেছেন-যদিও সে দাবি যুক্তির দ্বারা সমর্থিত নয়।


নারায়ণদেবের সময় সম্বন্ধে কোনো সুনিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁর কোনো পুঁথিতে পনানির্ণয়-সংক্রান্ত কোনো ইঙ্গিত নেই। অবশ্য বাংলাদেশ বিভক্ত হবার আগে ঐ গ্রামে তাঁর বংশধারা বর্তমান ছিল। তাঁদের কাছে রক্ষিত বংশতালিকা থেকে অনুমান হয় কবি পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি বর্তমান ছিলেন। তা হলে তাঁর কাব্য বিজয়গুপ্ত-বিপ্রদাসের সমকালেরই হতে পারে। তবে এ-ও আমাদের অনুমান মাত্র। কবি হুসেন শাহের সময়ে কাব্য রচনা করলে প্রবলপ্রতাপান্বিত সুলতানের নাম উল্লেখ করতে ভুলতেন না, বিজয়গুপ্ত ও বিপ্রদাস দু'জনেই সুলতানের নাম করেছেন। কেউ কেউ তাঁকে বিপ্রদাসের পরবর্তী বলতে চান। আমরা এ অনুমানও সমর্থন করি না। কারণ বিপ্রদাসের ভাষার চেয়ে তাঁর ভাষায় প্রাচীনত্বের অধিকতর লক্ষণ আছে যদিও তাঁর কাব্য বহুবার নকল হয়েছে। বেশি জনপ্রিয় বা নকল হলে কাব্যের ভাষা বদলে গিয়ে যুগোপযোগী রূপ ধারণ করে।
 নারায়ণদেবের ভাষা কিন্তু সেই দিক দিয়ে অনেকটা প্রাচীন। নারায়ণদেব যে একজন শক্তিশালী কবি ছিলেন, তা তাঁর বিরাট পুঁথি থেকেই বোঝা যায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক দিন আগে তাঁর যে কাব্য প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে পালাবিন্যাসে নানা গণ্ডগোল আছে; সেই গ্রন্থ থেকে কবি-প্রতিভার সম্যক পরিচয় পাওয়া যাবে না। নারায়ণদেব লৌকিক মঙ্গলকাব্য ফাঁদলেও সংস্কৃত সাহিত্যে বিশেষ অভিজ্ঞ ছিলেন, তার নানা প্রমাণ সমগ্র কাব্যের মধ্যেই ছড়িয়ে আছে। তিনি একটু পুরাণ-ঘেঁষা কবি ছিলেন, লৌকিক মনসাকাহিনীর চেয়ে পৌরাণিক দেবদেবীর লীলার প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। মহাভারত, শৈব পুরাণ, কালিদাসের কুমারসম্ভব প্রভৃতি সংস্কৃত উপাদান থেকে তাঁর দেবখণ্ডের কাহিনী সংগৃহীত হয়েছে। হরপার্বতী লীলায় বহুস্থলে কুমারসম্ভবের সাক্ষাৎ প্রভাব আছে। রঙ্গব্যঙ্গ ও করুণরসে তাঁর সমান অধিকার বিস্ময়কর, বিশেষত ব্যঙ্গের তির্যকতা তাঁর কাব্যের একটি বিশিষ্ট লক্ষণ। বণিক সম্বন্ধে তাঁর ব্যঙ্গোক্তি চমৎকার:
কাক হস্তে সেয়ানা জে বানিয়া ছাওয়াল। 
বানিআ হস্তে ধুত্ত যেই তারে দেই পানি।।
স্বামীর মৃতদেহ সঙ্গে নিয়ে অকূল সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে বেহুলার বিলাপ খুবই মর্মস্পর্শী হয়েছে:
জাগ প্রভু কালিন্দী নিশাচরে। 
ঘুচাও কপট নিদ্রা ভাসি সাগরে।।
প্রভু রে তুমি আমি দুই জন। জানে তব সর্বজন।।
তুমি তো আমার প্রভু আমি যে তোমার। 
মড়া প্রভু নহ রে তুমি গলার হার।।

চরিত্রসৃষ্টি, রসবৈচিত্র্য ও কাহিনী গ্রন্থনে নারায়ণদেব বিশেষ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। এদিক থেকে তাঁর স্থান বিজয়গুপ্ত ও বিপ্রদাসের চেয়ে অনেক উঁচুতে। কেউ কেউ তাঁর কাব্যের বিস্তার, করুণ রস ও চরিত্র-চিত্রণ স্মরণ করে তাঁকে মহাকবি আখ্যা দিতে চান, এ-সব অতিভক্তির বাড়াবাড়ি। মধ্যযুগে একজনও মহাকবি জন্মাননি। মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছাড়া বাংলাদেশে, কী মধ্যযুগ, আর কী আধুনিক যুগ-দ্বিতীয় কোনো মহাকবির আবির্ভাব হয়নি। এখানে মধ্যযুগের আদিপর্ব অর্থাৎ প্রাক্-চৈতন্যযুগের আলোচনা শেষ হল। এই সামান্য পরিচয় থেকে নিশ্চয় বোঝা যাবে, এই যুগে বাংলা সাহিত্যের শুরু হয়েছে, কিন্তু তখনও পুরো উৎকর্ষ লাভ হয়নি। পঞ্চদশ শতকের শেষপ্রান্তে চৈতন্যাবির্ভাবের পর থেকে তাঁর প্রভাবে বাংলা সাহিত্যের যে অভূতপূর্ব উন্নতি হল, পরের পর্বে আমরা তাঁর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেব।


লেখকের পরিচিতি বালুরঘাট দক্ষিন দিনাজপুর

উজ্জল দেবনাথ


👇WhatsApp link👇

Post a Comment

0 Comments